আজ ১৩ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদার মুক্ত হয় মির্জাপুর উপজেলা। দীর্ঘ ৮ মাস ১০ দিন যুদ্ধের পর দামাল ছেলেরা পাকহানাদার বাহিনীর হাত থেকে মির্জাপুরকে মুক্ত করে। ১৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হলেও স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও নির্মাণ হয়নি কোন স্মৃতি ফলক ও চিহ্নিত হয়নি গন কবর।
সোমবার (১৩ ডিসেম্বর) উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা সরকার হিতেশ চন্দ্র পুলক জানান, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক আহবানে সারা দিয়ে টাঙ্গাইলে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। এর নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সাংসদ এবং বর্তমান টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সাবেক এমপি জননেতা ফজলুর রহমান ফারুক, কৃষক শ্রমিক জনতালীগের চেয়ারম্যান ও সাবেক সাংসদ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম এবং সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা একাব্বর হোসেন। উপজেলা মির্জাপুর উপজেলায় মোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৮৯২ জন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ১১ নং সেক্টরের অধীনে এখানে যুদ্ধ হয়। আজাদ কামাল বীর বিক্রম আহত হয়েছিলেন।
তিনি জানান, মির্জাপুরে রাজাকার কমান্ডার ছিলেন সদরের মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ। তার নেতৃত্বেই মির্জাপুর উপজেলার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চালাও পোড়াও এবং নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। ৩রা এপ্রিল ঢাকা-টাংগাইল মহাসড়ক সংলগ্ন গোড়ান- সাটিয়াচড়ায় পাকসেনারা আসামাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা নর ঘাতকদের উপর গুলি চালায়। এই সম্মুখ যুদ্ধে ১০৭ জন মুক্তিপাগল বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয় এবং ইপিআর নিহত হয় ২৩ জন। পাকবাহিনী হাতে নিরীহ বাঙ্গালী হতাহতের পর গোড়ান -সাটিয়াচড়া মুক্ত হলেও পাকসেনারা ঘাটি করে বসে মির্জাপুর উপজেলা সদর, মির্জাপুর সাহাপাড়া, সরিষাদাইর, বাইমহাটি, পুষ্টকামুরী, বাংগলা, তরফপুর, ভড়রা ও নরদানা গ্রামে। পাকসেনারা আশেপাশের গ্রামে লূটপাট আর অগ্নিসংযোগ করে নিরীহ শতাধিক বাঙ্গালীকে হত্যা করে। ৭ মে দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা, তার একমাত্র পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা এবং ৮ মে থানা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবুল হোসেনের বৃদ্ধ পিতা জয়নাল সরকার ও মাজম আলীকে পুড়িয়ে হত্যা করে পাকবাহিনী। মির্জাপুর ও আন্ধরা গ্রামের রাখাল চন্দ্র সাহা, সুদাম চন্দ্র সাহা, নিতাই মেম্বার, পান্না লাল, জগবন্ধু রায় সহ শতাধিক নারী পুরুষকে পাকহানাদার বাহিনী এবং এদেশীয় দোসররা হত্যা করে লাশ লৌহজং নদীতে নিক্ষেপ করে।
হিতেশ চন্দ্র আরও জানান, ১২ ডিসেম্বর রাতে দেশমাতৃকার সূর্য-সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা মির্জাপুরের বংশাই, লৌহজং নদীর দুই পাশ ও চতুর্দিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল সম্মুখ যুদ্ধ। ১৩ ডিসেম্বর মুক্ত হয় মির্জাপুর। এমনিভাবে বহু রক্ত, ত্যাগ-তিতিক্ষার এবং সম্মুখ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৮ মাস ১০ দিন পর বংশাই, লৌহজং ও ধলেশ্বরী বিধৌত ১৪৪ বর্গমাইল আয়তন বিশিষ্ট মির্জাপুর উপজেলা ১৩ ডিসেম্বর ৪৯ বছর পূর্বে এই দিনে সম্পূর্ণভাবে হানাদার মুক্ত হয়। ১৩ ডিসেম্বর মির্জাপুর মুক্ত হলেও শহীদদের গণ কবর আজও চিহ্নিত হয়নি এবং নির্মাণ হয়নি কোন স্মৃতি ফলক।
দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৯ বছর। কিন্তু দিবসটি সরকারীভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় আজও পালিত হচ্ছে না। বর্তমান সরকার ১৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত দিবসটিকে সরকারী ভাবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাফিজুর রহমান এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর এনায়েত হোসেন মন্টু বরেন, ১৩ ডিসেম্বরকে ঘিরে এ বছর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সেরর সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিকে পুষ্প স্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া যে সব স্থানে গন কবর রয়েছে এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

![মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সেরর সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। [ছবি: ইত্তেফাক]](https://cdn.ittefaq.com/contents/cache/images/1100x617x1/uploads/media/2021/12/13/70a69694d19f4bcd8dfc8978c283d62c-61b6c293ea2c9.jpg?jadewits_media_id=8572)

0 Comments